সেই আঁখি এখন


জ্যাকসন হাইটসের রুজভেল্ট অ্যাভিনিউয়ের সাবওয়ে স্টেশনের পেছনে গেলাম প্রথমে। সেখান থেকে কিউ সেভেন্টি বাস ধরে সোজা লাগোয়ারডিয়া এয়ারপোর্ট। এত তাড়াতাড়ি চলে আসব ভাবিনি।

বাস থেকে নেমেই দেখি কালো শার্ট-কালো প্যান্ট, মাথায় গোলাপি ক্যাপ পরে আঁখি দাঁড়িয়ে আছেন। লাভলী চৌধুরী আঁখি। এক সময়ের দেশ সেরা শুটার। এখন লাগোয়ারডিয়া এয়ারপোর্টের ক্যাশ কাউন্টারে চাকরি করেন।

‘আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?’ আঁখি জানতে চাইলেন। বাসে থাকা অবস্থাতে তাঁকে ফোন করেছিলাম। সে জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন। বললাম, ‘বাস তো আরও আরামদায়ক মনে হলো গাড়ির তুলনায়।’ আঁখি আমাকে নিয়ে গেলেন বিশাল ফুডকোর্টে। এস্কেলেটর থেকে নেমে দেখি হুলুস্থুল অবস্থা! এমন কোনো ধরনের খাবার নেই যার স্টল নেই সেখানে। মাঝখানে বিশাল জায়গা। সেখানে বসে এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন অফিসাররা কেউ খাচ্ছেন, কেউ ল্যাপটপে কাজ করছেন। কেউ বা ঝিমোচ্ছেন।
আঁখি কিছু খাওয়ার জন্য খুব জোরাজুরি শুরু করলে আমি বললাম, কফি খাওয়ালেই চলবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কফির সঙ্গে চিজ ক্রিম দেওয়া ব্যাগেল নিয়ে এলেন। তাঁর তখন ব্রেকফাস্টের বিরতি চলছে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা ফিরে গেলাম অতীতে।
আঁখিকে আমি চিনি ১৯৯৯ সাল থেকে। যে বছর কাঠমান্ডু সাফ গেমসে প্রণ রাইফেলের দলগত ইভেন্টে স্বর্ণ জিতলেন তিনি, সাবরিনা সুলতানা আর কাজী শাহানা পারভীন। ওই বছরই পেশাদার ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হয়। তারপর কেটে গেছে বহুদিন। আঁখির সঙ্গে পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও এক ধরনের বন্ধুত্ব হয়েছে। গুলশানে শুটিং কমপ্লেক্সে গেলেই তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। ২০১৪ সালে আমরা দুজনেই চলে আসি নিউইয়র্কে। এখানে এসে আমাদের সখ্য আরও গাঢ় হয়েছে। আঁখির জীবনের খুঁটিনাটি অনেক কিছুই আমি জানি। তবু ভিন্ন পরিবেশে নতুন জীবন যাপন দেখার জন্য সাত সকালে গিয়ে হাজির হলাম তাঁর কর্মক্ষেত্রে।
জীবন কখনো কখনো গল্পের চেয়েও বিস্ময়কর হয়। নাটকীয়তা বেশি থাকলে সেই গল্পকে পাঠকের অবাস্তব মনে হতে পারে। তার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মানুষের জীবনে কি এত উত্থান-পতনও ঘটে? কিন্তু বাস্তব যে গল্পের চেয়েও নাটকীয় হতে পারে, আঁখিই তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
হয়তো এই গল্পের সমাপ্তি এখনো ঘটেনি। ভবিষ্যতের গর্ভে থাকতে পারে আরও বড় কোনো চমক। তবে এখানে এসে কাহিনি বেশ মিলনান্তক। দুঃসহ অতীতের স্মৃতি ভুলতে যে মেয়েটি একদিন নিউইয়র্কে এসেছিল, অচেনা শহরে মাথা তুলে বাঁচতে চেয়েছিল, সে সেটা করে দেখিয়েছে, সে জয়ী হয়েছে জীবনের লড়াইয়ে!
আঁখি কেবল দেশসেরা শুটারই ছিলেন না, ছিলেন প্রতিশ্রুতিশীল কোচও। সেখানেও জাতীয় পর্যায় থেকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কুয়েত জাতীয় নারী শুটিং দলের কোচ হিসেবে কাজ করার জন্য ডাক পেয়েছিলেন আঁখি। বাংলাদেশের কোনো কোচের দেশের বাইরে শুটিং দলের দায়িত্ব পাবার ঘটনা কিন্তু এটাই প্রথম। কিন্তু এক ঝড় এসে তছনছ করে দিল তাঁর জীবন। আর তারপর সবকিছু ছেড়ে চলে এলেন নিউইয়র্কে।
২০১৪ সালের আগস্টে নিউইয়র্কে আসেন আঁখি। শুরুতে একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি করেছেন। সেখানকার কাজটা অনেকটা মৌসুমভিত্তিক বলে চলে গেছেন অন্য পেশায়। বর্তমান কাজটা কঠিন হলেও বেতন বেশ ভালো বলে জানান আঁখি। ভোর পাঁচটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত ডিউটি। কাজে যাবার জন্য বাসা থেকে বের হতে হয় চারটার দিকে। উডসাইডের বাসা থেকে বাস ধরে সরাসরি চলে আসেন কাজের জায়গায়। সেখানে সহকর্মীরা এখন সেরা বন্ধু। শাম্মী, রিংকু, সোমা, মিথুন, রুমা, এ্যাঞ্জেলিনাদের সাথে কাজের পরে ঘুরতেও বের হন আঁখি।
এভাবেই কি জীবনের গতিপথ পরিবর্তিত হয়? ছিলেন শুটার। খেলা ছেড়ে হলেন কোচ। এটাকেই জীবনের গন্তব্য ভেবেছিলেন। শুটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চেয়েছিলেন আজীবন। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা এলোমেলো করে দিল সবকিছু।
২০১৩ সালের ঘটনা। কোরবানি ঈদের পরে শ্বশুরবাড়ি পাবনা থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আঁখির স্বামী ও এক সময়ের দেশসেরা শুটার ফিরোজ হোসেন পাখি নিহত হন। চিরতরে হারাতে হয় আড়াই বছর বয়সী শিশুকন্যা পুস্পিতাকে। ফিরোজ হোসেন পাখির সঙ্গে বিয়ের অনেক বছর পরে, অনেক সাধ্য সাধনার পরে মা হয়েছিলেন আঁখি। সৃষ্টিকর্তার কাছে অনেক প্রার্থনা করে পেয়েছিলেন মেয়েকে। অথচ সেই মেয়েকে হারাতে হলো অকালে।
দুর্ঘটনার সময় গাড়ি চালাচ্ছিলেন ফিরোজ। সামনের আসনে ফিরোজের পাশে বসেছিলেন আঁখি। পেছনে সিটে গৃহকর্মীর পাশে বসেছিল পুষ্পিতা। ওই গৃহকর্মীও মারা যায়। পাবনা হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে আঁখির। ততক্ষণে তাঁর স্বামী ও মেয়ের জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি চলছে। সর্বস্ব খুইয়ে ঢাকায় ফেরেন আঁখি। সব কেড়ে নেবার পরে সৃষ্টিকর্তার হয়তো দয়া হয়েছিল। তাই স্বামী-সন্তানবিহীন নতুন জীবনে যেরকম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবেন ভেবেছিলেন, তেমনটি ঘটেনি।
ফিরোজ হোসেন পাখি ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুটিং দলের প্রধান কোচ। আঁখিকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। জাতীয় শুটিং ফেডারেশনে কোচিংয়ের দায়িত্বও পান। বেদনাদায়ক স্মৃতি ভুলে থাকার জন্য আঁখির তখন প্রয়োজন ছিল ব্যস্ততার। সেটাই তিনি পেলেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুল ইসলাম, শুটিং ফেডারেশনের বর্তমান সভাপতি নাজিমুদ্দিন চৌধুরী দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য। শ্বশুর বাড়ির সবাই, বিশেষ করে ফিরোজ হোসেন পাখির বড় ভাই সুলতান মাহমুদ আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। কুয়েতে শুটিং কোচের চাকরির ব্যাপারে শুটিং ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ইন্তেখাবুল হামিদ অপুর সহযোগিতা পেয়েছেন।
১৯৯৯ সালে কাঠমান্ডু সাফ গেমসে এয়ার রাইফেলের দলগত ইভেন্টে স্বর্ণজয় আঁখির ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্য। এর বাইরে সাফ শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণালি সাফল্য আছে তাঁর। নারায়ণগঞ্জের মেয়ে আঁখির শুটিংয়ে হাতেখড়ি স্থানীয় রাইফেল ক্লাবে। খেলার ছাড়ার পরে ২০০৭ সালে কোচেস কোর্স করেন। ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে আসার বছরেই অর্থাৎ ২০১৪ সালে জাতীয় এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপে নিজ দল সেনাবাহিনীকে চ্যাম্পিয়ন করান আঁখি।
তিন বছর পরে গেল সোমবার নিউইয়র্ক ছেড়ে ঢাকায় উড়াল দেন আঁখি। তিন সপ্তাহের জন্য বেড়াতে গিয়েছেন সেখানে। নতুন শহরে দীর্ঘদিন একা থাকার পরে জীবনের প্রয়োজনে নতুন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন কামরুজ্জামান বাচ্চুকে। পুরোনো কর্মস্থল ট্রাভেল এজেন্সির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ওখানে পরিচয় হওয়ার পরে আঁখিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন বাচ্চু। বিয়ের পরে এখন সুখে আছেন তাঁরা।
আঁখির বাংলাদেশে আসার খবর পেয়ে শুটিং ফেডারেশনের সবাই খুব আনন্দিত। ফেডারেশনের বর্তমান সভাপতি নাজিমুদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক অপু হামিদ তো বলেই দিয়েছেন, আঁখি ঢাকায় এসে পুনরায় বসবাস শুরু করলে তাকে আবার কোচের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সমসাময়িক শুটার সাবরিনা সুলতানা থেকে আরম্ভ করে আঁখির আরেক কর্মস্থল সেনাবাহিনী শুটিং রেঞ্জের সবাই খুব খুশি তাঁর আগমনের খবরে। তবে আনন্দ করার আগে আঁখি ছুটে যাবেন পাবনা শহরে, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছে ওর মেয়ে পুষ্পিতা আর তার বাবা।
আসলে নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন থাকার ইচ্ছে নেই আঁখির। তাঁর ভাষায়, ‘সারা জীবন তো আমি এত কঠিন পরিশ্রম করতে পারব না। আর হয়তো দশ বছর, তারপর ঢাকায় চলে যাব ভাবছি। ওখানে মেট্রো শপিং মলে ‘গয়না প্যালেস’ নামে একটা দোকানে আমার শেয়ার আছে। তারপর নারায়ণগঞ্জে নিজের বাড়ি, মিরপুরে ফ্ল্যাট আছে। আর্থিক কোনো সমস্যা হবে না। শেষ জীবনটা শুটিংয়ের সাথে যুক্ত থেকে কাটাতে চাই।’
তবে নিউইয়র্ক শহরের জীবনকে কখনো ভুলতে পারবেন না আঁখি। কারণ এই জীবন তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। কঠিন পরিবেশে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয় সেই শিক্ষা দিয়েছে। জীবনে বেদনার স্মৃতি ভুলে থাকতে একটা অচেনা পরিবেশ প্রয়োজন ছিল আঁখির। দুঃস্বপ্ন কেটে গিয়ে আবার নতুনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি। নতুন জীবনে পেয়েছেন শাম্মী, মাকসুদা, সেলিনা, বুলবুলি, পর্নার মতো বন্ধুদের। আর তাই পেছনে ফিরে তাকাতে চান না তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *